এম. মনছুর আলম, চকরিয়া :
টানা চার দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে কক্সবাজারের চকরিয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যার পানিতে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন এবং চকরিয়া পৌরসভার অন্তত ১২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে দুই লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বন্যার কারণে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অধিকাংশ এলাকায় টিউবওয়েল, রান্নাঘর ও চুলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও বাড়ির চালা পর্যন্ত পানি উঠে যাওয়ায় অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে।

এদিকে, মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরিত্যাখালী এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ৫০ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এতে উপকূলীয় সাতটি ইউনিয়নে নতুন করে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। তলিয়ে গেছে গ্রামীণ সড়ক, ধানের বীজতলা, সবজিক্ষেত, মৎস্যঘের ও ফসলি জমি। অনেক স্থানে পুকুরের মাছও ভেসে গেছে।

অবিরাম বৃষ্টির মধ্যে বৃহস্পতিবার ভোরে বরইতলী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মোহছেনিয়া কাটা গ্রামে পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে রুমি আক্তার (১৫) ও তার ভাই মোহাম্মদ তৌসিফ (১০)-এর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলা সদর থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ের অধিকাংশ সড়ক কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। ফলে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। জরুরি প্রয়োজনে মানুষ নৌকায় চলাচল করছেন।
কাকারা, সুরাজপুর-মানিকপুর, বমুবিলছড়ি, লক্ষ্যারচর, ফাঁসিয়াখালী, কৈয়ারবিল, হারবাং, বরইতলী, ডুলাহাজারা, খুটাখালী, চিরিংগা, সাহারবিল, পূর্ব বড় ভেওলা, বিএমচর, কোনাখালী, ঢেমুশিয়া, পশ্চিম বড় ভেওলা, বদরখালী ইউনিয়ন এবং চকরিয়া পৌরসভার অধিকাংশ এলাকা কোমর থেকে গলাসমান পানিতে তলিয়ে গেছে।
চকরিয়া পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র শহীদুল ইসলাম ফোরকান বলেন, টানা বৃষ্টিতে পৌরসভার অন্তত ৩০টি গ্রাম ও পাঁচ শতাধিক পরিবার জলাবদ্ধতায় আটকা পড়েছে। মাতামুহুরী নদীর প্রবল স্রোতে পৌরশহর রক্ষা বাঁধসহ আশপাশের বেড়িবাঁধ ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
চিরিংগা ইউনিয়নের সদস্য আলী আহমদ বলেন, সওদাগরঘোনা, বুড়িপুকুর, চরনদীপ ও রাবার ড্যামসংলগ্ন গ্রামগুলো পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছালেকুজ্জামান বলেন, ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানির নিচে চলে গেছে। মানুষ রান্না করতে পারছে না, নৌকাই এখন চলাচলের একমাত্র ভরসা।
বিএমচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস. এম. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পুরিত্যাখালী এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় উপকূলীয় সাত ইউনিয়নের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহিদুর রহমান কাইছার বলেন, নদীর পানি বেড়ে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে। সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
পশ্চিম বড় ভেওলা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হেফাজতুর রহমান চৌধুরী টিপু বলেন, ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে চিংড়ি চাষের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
কাকারা ইউনিয়নের মাঝেরফাঁড়ির বাসিন্দা সিনিয়র সাংবাদিক এম. আর. মাহমুদ বলেন, পাহাড়ি ঢলের পানি ঘরে ঢুকে পড়ায় পরিবার নিয়ে চরম দুর্ভোগে রয়েছি। রান্নাবান্না করাও সম্ভব হচ্ছে না।
সাহারবিল ইউনিয়নের কৃষক সৈয়দ আলম বলেন, আমনের বীজতলা ও সবজিক্ষেত তলিয়ে গিয়ে বড় ধরনের কৃষি ক্ষতি হয়েছে।
চকরিয়া পৌরসভার রিকশাচালক শহিদুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির কারণে যাত্রী কমে গেছে। সারাদিন রিকশা চালিয়েও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
চকরিয়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মঈন উদ্দিন বলেন, বন্যার কারণে অধিকাংশ মানুষ শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছেন। আমিও পানিবন্দি হয়ে আছি।
মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সোয়াইবুল ইসলাম সবুজ বলেন, কোনাখালী ইউনিয়নের পুরিত্যাখালী ও মরংঘোনা এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, উজানের ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কোনাখালী ইউনিয়নের পুরিত্যাখালী পয়েন্টে প্রায় ৫০ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এছাড়া আরও কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক মাঠে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং বাঁধ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীদ দেলোয়ার বলেন, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে মাতামুহুরী নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে এবং পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য উপকূলীয় এলাকার স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, বন্যাদুর্গতদের জন্য ইতোমধ্যে ৩০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন এলাকায় শুকনো খাবার বিতরণ চলছে। অতিরিক্ত ত্রাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) চালু করা হয়েছে এবং সার্বিক পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
